ডায়ালাইসিস কি এবং কত টাকা খরচ হয়

মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে কিডনি। প্রতিটি মানুষের দুটি করে কিডনি থাকে। এই অঙ্গটির কাজ হচ্ছে শরীরের রক্তের থাকা বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশন করে দেহ থেকে বের করে দেওয়া। কিন্তু কোন কারণে যদি এটি বিকল হয়ে যায় তাহলে আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে রক্ত পরিশোধনের কাজ করা হয়। আজকে আমরা জানবো এই পদ্ধতি অর্থাৎ ডায়ালাইসিস কি এবং এটি করতে কত টাকা খরচ হয়ে থাকে।

আমাদের দেহের অভ্যন্তরে প্রতিটি মুহূর্তে বিপাকীয় কার্যক্রম চলমান থাকে। এর মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরে লবণ এবং অন্যান্য উপাদানের ভারসাম্য রক্ষা হয়। যদি কোন কারণে কিডনি বিকল হয়ে যায় তাহলে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে শ্বাসকষ্ট হওয়া, শরীর ফুলে যাওয়া, মুখ ফোলা, হাতে পায়ে পানি আসা, রক্তশূন্যতা, খিচুনি ইত্যাদি। এ সকল উপসর্গগুলো দেখা দেয় কারণ শরীরের রক্তের বিভিন্ন উপাদান গুলোর মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়। সেই সাথে কিডনি যেহেতু রক্তকে পরিষ্কার করতে পারে না তাই বর্জ্য পদার্থ বৃদ্ধি পায় এবং মানুষ ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে শুরু করে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা মেশিনের মাধ্যমে ডায়ালাইসিস করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ কৃত্রিম উপায়ে একটি মেশিনের সাহায্যে শরীরে রক্তগুলোকে পরিষ্কার করা হয়। যদি কোন ব্যক্তির দুইটি কিডনিই বিকল হয়ে যায় তাহলে তাকে বাকি জীবন ডায়ালাইসিসের মাধ্যমেই বেঁচে থাকতে হয়। এখন পর্যন্ত সাধারণত হিমোডায়ালাইসিস ও পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস এই দুই ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে।

ডায়ালাইসিস কিভাবে করা হয়

সাধারণত ক্যাথেটার এবং ফিস্টুলার মাধ্যমে ডায়ালাইসিস করা হয়ে থাকে। ফিস্টুলা সাধারণত হাতে করা হয়। ক্যাথেটার পায়ে এবং গলায় উভয় জায়গায়ই করা যায়। এটির মাধ্যমে আমাদের শরীরের রক্তনালীর সাথে একটি আলাদা সংযোগ তৈরি করা হয়। যে সংযুক্তি সাধারণত ডায়ালাইসিস মেশিনের সাথে যুক্ত করে রক্ত পরিশোধনের কাজ করা হয়।

রোগীর অবস্থার উপর ভিত্তি করে সাধারণত বাকি জীবন এটিই করতে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটি সেশনের পর পেশেন্ট যদি পুরোপুরিভাবে সুস্থ হয়ে থাকে তাহলে এটি দীর্ঘদিন পর পর অথবা বন্ধ করা যেতে পারেন ডাক্তাররা। এ ধরনের রোগের ক্ষেত্রে সাধারণত ফিস্টুলা করার কোন প্রয়োজন হয় না।

ডায়ালাইসিস করতে কত টাকা খরচ হয়

এটি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের উপর । বর্তমানে সরকারিভাবে ডায়ালাইসিস করতে ৪২০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে থাকে। আর বিভিন্ন প্রাইভেট এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গুলোতে ২২০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫-৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়ে থাকে প্রতি ডায়ালাইসিসের জন্য।

আবার যাদেরকে নিয়ে সমস্যার পাশাপাশি হার্টের সমস্যাও রয়েছে তাদের জন্য বিশেষ মেশিনের সাহায্যে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়। সে ক্ষেত্রেও টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি ডায়ালাইসিসের সাথে বাড়তি মেডিসিন ইনজেকশন স্যালাইন যুক্ত হতে পারে। পেশেন্টের উপর নির্ভর করে এগুলোর খরচ মোট খরচের সাথে যুক্ত হয়ে থাকে।

ডায়ালাইসিস কতদিন পর পর করতে হয়

হিমোমোডালাইসিস সাধারণত সপ্তাহে দুইদিন করতে হয়। অর্থাৎ তিন থেকে চার দিন পর পর। নির্ধারিত দিনে হাসপাতালে যাওয়ার পর এটি শুরু করা হয় এবং সাধারণত গড়ে চার ঘণ্টা করে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। তাই এর জন্য শারীরিক এবং মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়। অবশ্য পেরিটোনিয়াল ডালাইসিস বাসায় বসেই নেওয়া যায়। তবে এই পদ্ধতিতে খরচ অনেকটাই বেশি হয় এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশ রয়েছে। তাই এটি খুব বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি। সেদিক থেকে হিমোডায়ালাইসিস সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকেই নেওয়া যায়।

ডায়ালাইসিস সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়

• চিকিৎসকদের মতে যারা নিয়মিত ডায়ালাইসিস গ্রহণ করছেন তাদেরকে পর্যাপ্ত পরিমাণে আমিষ খেতে হবে।

• যেহেতু রোগীর দুইটি কেডনিই বিকল হয়ে যায় তাই মেশিনের মাধ্যমে সমস্ত বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করা হয়। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের মেডিসিনও প্রয়োজন হয়।

• নিয়মিত এই ধরনের চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করলে রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে রক্তস্বল্পতা কিংবা আয়রনের অভাব দেখা দিতে পারে। তাই রক্ত তোর জন্য ইনজেকশন মেডিসিন এবং অনেক ক্ষেত্রে আলাদাভাবে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

• রোগী প্রতিদিন কতটুকু পরিমান পানি পান করবেন সেটি বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর ডাক্তার নির্দিষ্ট করে দেন।

• পটাসিয়াম যুক্ত খাবার সাধারণত এড়িয়ে চলতে হয়। বিশেষ করে ডাবের পানি, কলা, কামরাঙ্গা ইত্যাদি।

যেহেতু হিমোডায়ালাইসিস হেপারিন ব্যবহার করা হয় তাই অনেক ক্ষেত্রে রোগীর হাড় ক্ষয়ের মত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে আলাদাভাবে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে হয়।

আশা করি ডায়ালাইসিস কি এবং এটি কতদিন পরপর করতে হয় এ সকল বিষয়ে ছাড়াও খুঁটিনাটি অন্যান্য সবকিছু সম্পর্কে আপনারা ধারণা লাভ করতে পেরেছেন। এ ধরনের আক্রান্ত রোগীর কোন কারণে চিকিৎসা সেক ব্যাহত হলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আমরা যারা সুস্থ হয়েছে তাদেরও উচিত নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া।

Leave a Comment